ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরা আমাদের এই বাংলাদেশ। এদেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মন্দির, মঠ , দেউল , মসজিদ । তেমনি এক অজানা মন্দির হলো পরেশনাথ মন্দির। সাধারণ জনগণের কাছে বর্তমানে এটি একটি শিব মন্দির হিসেবে পরিচিত হলেও পরেশনাথ মন্দির ছিল মূলত একটি জৈন মন্দির। রংপুর জেলার মাহিগঞ্জ থানায় অবস্থিত এই মন্দির রংপুর শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উওরে। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। এখানে নিত্য পুজা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব হয় যেমনঃ রাসউৎসব, শিবরাত্রি, ইত্যাদি। “পরেশনাথ” নামের অর্থ “যিনি সবার প্রভু” আবার সংস্কৃত ভাষায় পরেশনাথ এর অপর নাম “পার্শ্বনাথ”। পার্শ্ব=পাশে/কাছে , নাথ=প্রভু /ঈশ্বর । অর্থাৎ যিনি সবার আশ্রয় ।

ছবি : পরেশনাথ মন্দির {বর্তমান অবস্থা}
মাহিগঞ্জ পরেশনাথ মন্দিরের ইতিহাস সন্ধান :
পরেশনাথ মন্দিরের ইতিহাস সম্বন্ধে তেমন কোনো নথি কিংবা প্রামান্য দলিল পাওয়া যায় না। তাই এর প্রেক্ষাপট অনুসন্ধানের জন্য রংপুর ও মাহিগঞ্জ এর ইতিহাসকে পর্যালোচনা করে ধারণাগতভাবে সমন্বয় করা হয়েছে।
পরেশ নাথ মন্দির সর্ম্পকে জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে রংপুর এর ইতিহাস। আজকের রংপুর এবং আগের রংপুর এর মধ্যে অনেক পার্থক্য। রংপুর সিটি তৈরি হওয়ার আগে রংপুরের মূল কেন্দ্র ছিল মাহিগঞ্জ যা আদিরংপুর নামে পরিচিত। মাহিগঞ্জ নামটি এসেছে “মাহি”= মাছ এবং “গঞ্জ”=নগর থেকে। অর্থাৎ, এই জায়গার সাথে মাছের বাজারের সম্পর্ক আছে। মাছ আছে কিন্তু নদী থাকবে না তা হয় না। পৃথিবীর সব নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদী কে কেন্দ্র করে সেই সুত্র ধরে এগিয়ে পাওয়া যায় যে, মাহিগঞ্জ গড়ে উঠেছে ইছামতি নদীর তীরে। “ইছামতি” নদীর সাথে সবাই পরিচিত হলেও এটি পদ্মা নদীর উপনদী নয়, এটি রংপুর অঞ্চলের ইছামতি নদী যা তিস্তা নদীর শাখা নদী। এই ইছামতি নদীর বর্তমান অবস্থা দেখতে গিয়ে নালা ছাড়া কিছু পাওয়া যায় নি।
যে নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল আদি রংপুর-সেই ইছামতির নামও ভুলতে বসেছে এখানকার মানুষ। এমনি করে পানির অভাবে নাব্যতা হারিয়ে রংপুর অঞ্চলের নদীগুলো এখন মৃতপ্রায়। সীমান্তবর্তী দেশ ভারত উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অর্ধশতাব্দি আগেও এসব নদীতে ছিল উত্তাল যৌবনে পানির প্রবাহ ও প্রাণের স্পন্দন। এখন সেই যৌবনে ভাটা পড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে নদীর অস্তিত্ব। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ইছামতি নদীর তীরে আদি রংপুর মাহিগঞ্জ গড়ে উঠলেও রংপুরের মানুষ ভুলতে বসেছে সে নদীর নাম। অথচ এই ইছামতির পাশে গড়ে উঠেছিল রংপুর এর বৃহত্তম বন্দর (তথ্য : কালের কন্ঠ)।

ছবি : ইছামতি নদী ,মাহিগঞ্জ, রংপুর
নদী ও বন্দর এর সাথে হওয়ায় মাহিগঞ্জই ছিলো প্রাচীন রংপুরের কেন্দ্র। সমৃদ্ধ এই অঞ্চল প্রাচীন কাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসার জন্য দেশ বিদেশ থেকে আসত অনেকর। সব দিক দিয়ে মাহিগঞ্জ সুবিধাজনক হওয়ায় এখানে গড়ে উঠে রংপুর তাজ হাট রাজবাড়ী ,ডিমলা রাজবাড়ী, মাহিগঞ্জ বাজার ,রংপুর পাব্লিক লাইবেরিসহ ইত্যাদি স্থাপনা । ১৮ শতকে বাংলার ক্ষমতা ব্রিটিশ কোম্পানি পেলে মাহিগঞ্জ হয়ে উঠে ব্যাবসার এক বিশাল ক্ষেত্র । তৎকালীন সময়ে রাজস্থান থেকে আসা স্বর্ণ ব্যাবসায়ী মান্না লাল রায় এখানে সোনার বিশাল বাজার তৈরি করে (তথ্য : দ্য ডেইলি স্টার)। মাহিগঞ্জ এ প্রচুর রাজস্থানি এবং গুজরাটি ব্যবসায়ীরা বাস করত এমনকি এখনো ওই এলাকায় বড় বড় বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা মারোয়ারী এবং বিহারী। সুতরাং অনুমান করা যায় যে, ভারত থেকে আগত ব্যবসায়ীদের মধ্যে জৈন ধর্মাবলম্বী বণিকদের হাত ধরেই পরেশনাথ মন্দির নির্মিত হয়েছিল।
মাহিগঞ্জের ইতিহাস পর্যালোচনা করে এই অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, নদীবন্দর কেন্দ্রিক মাহিগঞ্জে যে বহুজাতিক বাণিজ্যিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিলো তারই একটি প্রামাণ্য নিদর্শন এই পরেশনাথ মন্দির।
ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ :
পরেশনাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা কাল সঠিক কবে তা নিয়ে বির্তক আছে। মন্দিরের পরিচালনা কমিটির কাছে কিছু পুরাতন দলিল দস্তাবেজ সংগৃহীত রয়েছে, তবে অনুমতির অভাবে সেইসব দেখা ও পাঠ সম্ভব হয় নি। তাই মন্দির সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের জন্য স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকার প্রদানকারীগণ হলেন- অরন্য ধর (স্থানীয় এলাকার ছাত্র), তপন শর্মা (বর্তমান মন্দির কমিটির সদস্য), ডা. মানস সেনগুপ্ত (পূর্ববর্তী মন্দির কমিটির সদস্য), শংকর চন্দ্র ধর (পূর্ববর্তী মন্দির কমিটির সদস্য), এবং জনৈক এলাকাবাসী। সাক্ষাৎকার থেকে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ হলো-
০১. মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৬০ খিষ্ট্রাব্দ (আনুমানিক)
০২. মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা গুজরাটি এবং রাজস্থানি বণিক এদের মধ্যে জীবণ চাঁননাহাটা এবং প্রেম চাঁননাহাটা প্রমুখ
০৩. ১৯৭৮ সালে মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয় তৎকালীন বড় ব্যবসায়ী এবং মারোয়ারি কিছু পরিবার এর সহযোগিতায়
০৪. মন্দিরটি দেবোত্তর এবং পরেশনাথ দেবতার নামে উৎসর্গ কৃ্ত সেই থেকে নাম দেওয়া হয়েছে পরেশনাথ মন্দির
০৫ . মন্দিরটি বহুকাল যাবৎ জঙ্গলআবৃত ছিল এবং এর মূল বিগ্রহ মন্দির এ ছিল না কিন্তু মন্দিরের দেয়াল এবং বেদী ভালো ছিল
০৬. লোকমুখে শোনা যায় বর্তমান শিব লিঙ্গটি রংপুরের অন্য আরেকটি মন্দির “করুণাময়ী কালীবাড়ী” থেকে নিয়ে পরেশনাথ মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়
০৭. অনেকে মনে করে এই মন্দির এর সাথে ঐতিহাসিক চরিত্র জগৎ শেঠ এর সম্পর্ক আছে
০৮. মুক্তিযুদ্ধের সময় এই মন্দিরের পাশে অবস্থিত রংপুর পাব্লিক লাইব্রেরী পাকিস্থানি হানাদারদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং লাইব্রেরীর সব বই পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং এখানে মন্দির সম্পর্কিত অনেক তথ্য ছিল । এছাড়াও মন্দিরে হামলা করে অনেককিছু ধ্বংস ও লুট করা হয়
এছাড়াও মন্দির এর দেয়ালের ফলক থেকে জানা যায় মন্দিরের সংস্কারের সময় । ২০০৪ সালে মন্দির টি আবার সংস্কার করা হয় এবং এটিও এক মারোয়ারি পরিবার থেকে করা হয়।

ছবি : মন্দিরের একটি নামফলক
মন্দিরের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য :
পরেশনাথ মন্দিরের স্থাপনা বারবার সংস্কার হওয়ার কারনে প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্যিক নিদর্শন পরিলক্ষিত হয় না। শুধুমাত্র মন্দিরের অভ্যন্তরে গর্ভগৃহের মূলবেদীটি আগের মতোই আছে। এই মূলবেদীর নির্মানশৈলী থেকে পরেশনাথ মন্দিরের আদি স্থাপত্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করা যায়।
মূলবেদীর বিবরণ : মন্দির এর গর্ভগৃহে অক্ষত বেদী স্থাপিত আছে। বেদীটি সম্পূর্ণ মকরানা মার্বেল দিয়ে তৈরি। এটির নির্মাণ শৈলীতে “মারু-গুর্জর” শৈলীর লক্ষ্যনীয়। মারু-গুর্জর হলো পশ্চিম ভারতের গুজরাট এবং রাজস্থানে ১১শ থেকে ১৩শ শতাব্দীর মধ্যে বিকশিত একটি অলঙ্কারপূর্ণ হিন্দু ও জৈন মন্দির স্থাপত্যশৈলী। এই শৈলীর স্থাপত্যে স্তম্ভ ও চূড়ার ব্যাবহার করা হয় এবং দেয়ালের বহির্গাত্রে খাঁজ ও কার্নিশের সমন্বয় থাকে। স্তম্ভ, ছাদ ও দেওয়ালের প্রতিটি অংশে সূক্ষ্ম ফুলের নকশা, পৌরাণিক চরিত্র ও মূর্তির নিখুঁত কাজ থাকে।
পরেশনাথ মন্দিরের মূলবেদীর নিচে্র অংশে রয়েছে সাদা মার্বেলের উচু পাটাতন। সামনের দিকে পদ্ম-দল বর্ডার করাচ। দুই পাশে দুটো স্তম্ভের গায়ে দ্বারপালের মূর্তি সংযুক্ত যারা ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে যাদের হাত ভগ্ন। তোরন/খিলান “ইন্দো-ইসলামিক কাস্পড আর্চ” যা রাজস্থানের স্থাপত্যের মূল বৈশিষ্ঠ্য। শিখর/ছাদ “বঙ্গজ/দোচালা” ধাচের এবং ছাদটি পদ্ম ও পদ্মকুড়ি দিয়ে অলংকৃত। পুরো বেদী টি একটি ছোট মন্দির যা “দেব-কুলিকা” র মতো। একে “ছত্রী-মন্ডপ” বলে। বেদীটি দেখে মনে হয় উৎকৃষ্ট মানের শ্বেতপাথর দিয়ে তৈরি করা যা তাজমহলের মার্বেল সদৃশ্য।
সুতরাং অনুমান করা যায় যে, গুজরাট এবং রাজস্থানের স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর সাথে বাংলার স্থানীয় শৈলীর সংমিশ্রণে পরেশনাথ মন্দিরের আদি স্থাপত্যটি নির্মিত হয়েছিল। এছাড়া মন্দিরের গর্ভগৃহকে কেন্দ্র করে চারপাশে আছে খোলা বারান্দা যা পরে সংযুক্ত হতে পারে ।

ছবি : পরেশনাথ মন্দিরের গর্ভগৃহের মূলবেদী
বিগ্রহ ও অন্যান্য প্রতিমা :
যেহেতু বর্তমানে পরেশনাথ মন্দিরে শিবের আরাধনা করা হয় তাই এর গর্ভগৃহের মূলবেদীতে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ, পাশে রয়েছে গরুড় ও ত্রিশূল। ১৯৭৮ সালে মন্দির সংস্কারের সময় কিছু খন্ডিত প্রতিমা পাওয়া যায় যেগুলো আজও মন্দির কমিটির অফিসে সংরক্ষিত আছে। খন্ডিত প্রতিমা গুলোর মধ্যে রয়েছে একটি হনুমানের মাথা, একটি গরুড়ের মূর্তি, এবং একটি জৈন তীর্থংকরের প্রতীমা। হনুমান এবং গরুড়ের মূর্তিগুলো বেলে পাথরের তৈরি যা খুব বেশি পুরাতন নয়।
ছবি : ভগ্ন হনুমানের মাথা

ছবি : গরুড় মূর্তি

ছবি : ঋষভনাথ/ আদিনাথ (জৈন তীর্থংকর )
পূর্বেই বলা হয়েছে, বর্তমানে পরেশনাথ মন্দির একটি হিন্দু মন্দির হলেও এটি মূলত জৈন মন্দির হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। মন্দির থেকে প্রাপ্ত জৈন তীর্থংকরের প্রতীমা এই বিষয়ের অকাট্য প্রামাণ্য দলিল। “পরেশনাথ/পার্শ্বনাথ” নামটি মূলত জৈন ধর্মের ২৪ জন তীর্থংকরের মধ্যে একজনের নাম । শিবের কোনো নাম “পরেশনাথ” হিন্দু ধর্মগ্রন্থে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ মন্দিরের নাম টি জৈন তীর্থংকরের নাম থেকে এসেছে মন্দির এর মূলবেদীর স্থাপত্য সাধারণত কোনো শিব মন্দিরে দেখা যায় না এবং শিবলিঙ্গ এর সাথে সবসময় জলাধার সংযুক্ত থাকে যা এই মন্দিরে নেই। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কারা করেছে তা নিয়ে সঠিক জানা না গেলেও তা যে বাঙ্গালিরা করেনি এটা নিশ্চিত । তৎকালীন মাহিগঞ্জ এ অনেক বিদেশী ছিল এবং তারা অনেকেই জৈন ধর্মালম্বীও ছিল। দলিল থেকে প্রাপ্ত নাম (প্রেম চাঁননাহাটা ও জীবণ চাঁননাহাটা) নামের পদবি কোনো হিন্দু পদবি না । এবং সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো মন্দির থেকে পাওয়া জৈন তীর্থংকরের মূর্তি ।প্রাপ্ত জৈন তীর্থংকরের মূর্তিটি “ঋষভনাথ/ আদিনাথ” এর। ঋষভনাথ (আদিনাথ) হলেন জৈন ধর্মের প্রথম তীর্থঙ্কর। তিনি অযোধ্যার রাজা নাভি ও রানি মরুদেবীর ঘরে জন্ম নেন। তাঁকে আদিনাথ, আদিশ্বর, যুগাদিদেবও বলা হয়। জৈনরা বিশ্বাস করে, ঋষভনাথ শুধু ধর্মের প্রবর্তক নন, তিনিই মানব সভ্যতার জনক। তিনিই মানুষকে প্রথম চাষবাস, আইন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলা, লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তাঁর কন্যা ব্রাহ্মীকে তিনি ব্রাহ্মী লিপি শেখান।সংসারের ক্ষণস্থায়ীতা বুঝে তিনি রাজ্য ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন। ১০০০ বছর তপস্যার পর কেবল জ্ঞান লাভ করেন এবং কৈলাস পর্বতে মোক্ষ প্রাপ্ত হন। তাঁর প্রতীক হলো ষাঁড় বা বৃষ, আর মূর্তিতে কাঁধ পর্যন্ত লম্বা জটা থাকে (তথ্য : জৈন শাস্ত্র কল্পসূত্র)। প্রাপ্ত ভাস্কর্যে দেখা যায় যে বাহন ঋষভ এবং মাথায় জটা আছে । মূর্তিটির নিচে দেবনগরী ভাষায় মূর্তির প্রতিষ্ঠাকাল এবং প্রতিষ্ঠাতার নাম লেখা যা অস্পষ্ঠ হয়ে গেছে এবং ভাষাগত অদক্ষতা থাকায় উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। তবে এটি যে জৈন মূর্তি তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
যেকোনো জৈন মন্দিরের বৈশিষ্ঠ্য হলো মূলদেবতার সাথে আরো কিছু দেবতা থাকে। পরেশনাথ মন্দির ও এর ব্যাতিক্রম নয় , অর্থাৎ স্থাপত্য এবং কিছু প্রমাণ সাপেক্ষে বলা যায় যে এটি হিন্দু মন্দির হওয়ার পূর্বে জৈন পরেশনাথ তীর্থংকরের মন্দির ছিল। পার্শ্বনাথ বা পরেশনাথ হলেন জৈন ধর্মের ২৩তম তীর্থঙ্কর এবং ইতিহাস-স্বীকৃত প্রথম তীর্থঙ্কর। খ্রিস্টপূর্ব ৮ম-৭ম শতকে বেনারসের রাজা অশ্বসেন ও রানি বামাদেবীর ঘরে জন্ম নিয়ে তিনি মহাবীরের ২৭৩ বছর আগে ধর্ম প্রচার করেন। তিনি চার মহাব্রত – অহিংসা, সত্য, অস্তেয় ও অপরিগ্রহ – প্রচার করেন, যার সাথে মহাবীর পরে ব্রহ্মচর্য যোগ করেন। তাঁর প্রতীক সাপ এবং মূর্তিতে মাথার উপর সর্পফণার ছত্র দেখা যায়। ঝাড়খণ্ডের সম্মেদ শিখর বা পরেশনাথ পাহাড়ে তিনি মোক্ষ লাভ করেন। তাঁকে কলিকালকল্পতরু বলা হয় এবং তিনি জৈন ধর্মের পুনরুজ্জীবক হিসেবে মান্য (তথ্য : জৈনসূত্র)।
পরিশিষ্ট :
পরেশনাথ মন্দির বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক পরিব্যাপ্তির মূর্ত প্রমান। পরেশনাথ মন্দির শুধু হিন্দু বা জৈন মন্দির নয় এটি মাহিগঞ্জ এবং রংপুরের সামাজিক , ধর্মীয় , রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক উত্থান-পতনের ঐতিহাসিক প্রমান। এটি রংপুরের সমৃদ্ধ সময়ের এক দলিল স্বরূপ। তবে এর সঠিক ইতিহাস নিয়ে আরো ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন আছে তেমনি রংপুরের মানুষের দায়িত্ব এই অমূল্য সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করা।
লেখক :

সুব্রত রায়
শিক্ষার্থী
শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদক :
নাহিন মাহমুদ
খণ্ডকালীন শিক্ষক
শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এবং
ট্রাস্টি সদস্য
বাংলাদেশ আর্ট ক্রিটিসিজম ট্রাস্ট