গ্লিম্পসেস : বাংলাদেশের সমসাময়িক ও আধুনিক শিল্পকলা (GLIMPSES: Contemporary & Modern Art of Bangladesh)

বাংলাদেশের বিজয় দিবসের ৫৪তম বার্ষিকী উপলক্ষে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং উত্তরা-ভিত্তিক গ্যালারি কায়া যৌথভাবে ‘গ্লিম্পসেস’ শিরোনামে একটি দলীয় শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এতে বাংলাদেশের ১২ জন আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। মুর্শিদ কাজীর বক্তব্যতে তিনি বলেন ‘ব্যাংকক আর্ট অ্যান্ড কালচার সেন্টার (BACC)-এ আয়োজিত “গ্লিম্পসেস: বাংলাদেশের আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্প—স্বাধীনতার ৫৪ বছর উদযাপন শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে আপনাদের স্বাগত জানাতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’

বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবসের ৫৪তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই প্রদর্শনী সংগ্রাম, ত্যাগ ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি জাতির প্রাণবন্ত শৈল্পিক অভিযাত্রার প্রতিফলন। বাংলাদেশের শিল্পচর্চা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, যা আমাদের জনগণের আবেগ, স্থিতিস্থাপকতা এবং সৃজনশীল কল্পনাকে দৃশ্যমান রূপ দিয়েছে।

এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা থাইল্যান্ডে আমাদের বন্ধুদের কাছে বাংলাদেশের—নদীমাতৃক ভূমি, আতিথেয়তা ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দেশ—একটি শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল বয়ান উপস্থাপন করতে চাই।

ব্যাংককস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে, ঢাকা-ভিত্তিক গ্যালারি কোয়া এবং চোনবুরি ও চিয়াং মাইয়ের অনারারি কনস্যুলেটের সহযোগিতায় এই প্রদর্শনীতে আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পকর্মের একটি নির্বাচিত সংগ্রহ উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব শিল্পকর্ম বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল পরিচয় ও বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।

এই উদ্যোগ সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের জনগণের মধ্যে গভীরতর সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।

বিএসিসি-তে বাংলাদেশ শিল্প প্রদর্শনীর এই দ্বিতীয় সংস্করণটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এই আন্দোলনের পেছনে ছিল আমাদের তরুণদের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীন কর্মসংস্থানের ন্যায্য দাবি। আন্দোলনের সময় জনসাধারণের পরিসরে উদ্ভূত শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত গ্রাফিতি শিল্প বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জীবনের সঙ্গে সংলগ্ন শিল্পের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

আমি আন্তরিকভাবে শিল্পপ্রেমী, কূটনৈতিক মহলের সদস্য এবং বাংলাদেশের বন্ধুদের এই প্রদর্শনী পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাই—যাতে তারা বাংলাদেশের সৃজনশীল চেতনা ও শৈল্পিক অভিব্যক্তিকে সংজ্ঞায়িত করা রং, রূপ ও আবেগের গভীরতা অনুভব করতে পারেন।

এই প্রদর্শনী যেন বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন এবং বাংলাদেশের জনগণের অদম্য ও স্থায়ী চেতনার এক উজ্জ্বল উদযাপন হয়ে ওঠে।

নদী স্রোত পেরিয়ে: গ্যালারি কায়ার থাইল্যান্ড প্রদর্শনী

প্রথমে আমি থাইল্যান্ডে  নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাননীয় হি. ই. মি. ফালিয়াজ মুরশিদ কাজী, চন বুরি ও চিয়াং মাইয়ের অনারারি কনসুলেটসমূহ, আমাদের পৃষ্ঠপোষকবৃন্দ এবং থাইল্যান্ডের বন্ধু ও সহযোগীদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া এই প্রদর্শনী বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না।

এমন এক সময়ে, যখন ভাবনা, চিত্র ও নান্দনিক ভাষা জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে দ্রুত প্রবাহিত হচ্ছে, গ্যালারি কায়ার থাইল্যান্ডে আয়োজিত এই প্রদর্শনী একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের চেয়েও অধিক তাৎপর্য বহন করে। এটি শিল্পের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সংলাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে সক্রিয় করার একটি সচেতন উদ্যোগ।

বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পগ্যালারি গ্যালারি কায়ার আয়োজনে এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের বারো জন শিল্পীর কাজ একটি থাই ভেন্যুতে উপস্থাপিত হয়েছে। স্মৃতি, বস্তুগততা, নগরজীবন এবং কল্পনাশীল চর্চার মতো অভিন্ন মানবিক তাগিদকে কেন্দ্র করে এই প্রদর্শনী বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড—দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে একটি অর্থবহ সংলাপ নির্মাণ করে। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি শিল্পী প্রতিভাকে দৃশ্যমান করার একটি কার্যকর হস্তক্ষেপ।

অভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রবাহ

ভাষা, ধর্ম ও ইতিহাসে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড উভয়ই নদীকেন্দ্রিক ভূগোল দ্বারা গঠিত সমাজ। বাংলাদেশে গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ এবং থাইল্যান্ডে চাও ফ্রায়া ও অন্যান্য জলপথ—উভয় ক্ষেত্রেই নদী বসতি, কৃষি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কল্পনাকে দীর্ঘকাল ধরে প্রভাবিত করেছে। এই বাস্তবতা উভয় সংস্কৃতিতে প্রবাহ, ঋতুচক্র ও স্থিতিস্থাপকতার প্রতি একটি সাধারণ নান্দনিক সংবেদন গড়ে তুলেছে।

ধর্মীয় ও আচারিক জীবনেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাযুজ্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ প্রধানত মুসলিম এবং থাইল্যান্ড প্রধানত বৌদ্ধ হলেও, উভয় সমাজেই সামষ্টিক উৎসব, ভক্তিমূলক শিল্প এবং লোকধর্মের সমন্বয়বাদী রূপ শক্তিশালীভাবে উপস্থিত। বাজার, শোভাযাত্রা, উপাসনাস্থল ও দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যভাষা—রং, অলংকার, নকশা ও পাওয়া বস্তু—সমকালীন শিল্পে বিষয় ও নির্মাণ-পদ্ধতি হিসেবে প্রতিফলিত হয়।

উভয় দেশের সমৃদ্ধ বস্ত্রঐতিহ্যও শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাংলাদেশের বুনন ও রঞ্জন কৌশল এবং থাইল্যান্ডের জটিল বস্ত্রঐতিহ্য সমকালীন শিল্পীদের হাতে ইনস্টলেশন, মিশ্রমাধ্যম ও ভাস্কর্যধর্মী কাজে নতুন রূপ ও অর্থ লাভ করে।

নগর অভিজ্ঞতা ও সমকালীন প্রশ্ন

ঢাকা ও ব্যাংকক—উভয়ই দ্রুত রূপান্তরশীল মহানগর, যেখানে অবকাঠামোগত পরিবর্তন, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও পরিবেশগত ঝুঁকি সমানভাবে বিদ্যমান। এই নগর বাস্তবতা আবাসন, শ্রম, দৃশ্যমানতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন উত্থাপন করে, যা উভয় দেশের শিল্পীদের কাজেই প্রতিফলিত হয়। প্রামাণ্যচর্চা, সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত প্রকল্প এবং কল্পনাশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণের মাধ্যমে শিল্পীরা এসব অভিজ্ঞতাকে অনুসন্ধান করেন।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রেক্ষিত

পশ্চিমা শিল্পকেন্দ্রের বাইরে অবস্থানরত গ্যালারি ও শিল্পীদের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একটি বাস্তব প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিল্পচর্চা প্রায়ই বৈশ্বিক শিল্পবয়ানের প্রান্তে অবস্থান করলেও, এই প্রদর্শনী শিল্পীদের জন্য নতুন দৃশ্যমানতা ও সম্পর্কমূলক পুঁজি তৈরি করে। থাইল্যান্ডে প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিউরেটর, সংগ্রাহক, সমালোচক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

গ্যালারি কায়ার কিউরেটোরিয়াল অবস্থান

আয়োজক হিসেবে গ্যালারি কায়ার ভূমিকা কেবল লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি বাংলাদেশি গ্যালারির উদ্যোগে থাইল্যান্ডে প্রদর্শনী আয়োজন সাংস্কৃতিক বিনিময়কে একমুখী পশ্চিমমুখী প্রবাহ হিসেবে দেখার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি দেখায় যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক হতে পারে সমানতাল, পারস্পরিক ও সৃজনশীল।

ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসা শিল্পীদের এই সমাবেশ কৌশল, উপকরণ ও ভাবনার আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করে, যা শিল্পী বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার সম্ভাবনা প্রসারিত করে।

গৌতম চক্রবর্তী

পরিচালক

গ্যালারি কায়া

আশরাফুল হাসান একজন চিন্তাশীল শিল্পী, যাঁর চিত্রকর্ম নতুন ও সতেজ ভাবনার দিকে দর্শককে আহ্বান জানায়। তিনি অ্যাক্রিলিক, চারকোল ও প্যাস্টেল মাধ্যমে আধা-রূপক চিত্রভাষায় সূক্ষ্ম বিবরণে কাজ করেন। তাঁর শিল্পে বন উজাড়, নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে প্রকৃতি ও মানবতার অমানবিক দিকগুলোর ক্ষয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। গাছ ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে তিনি একীভূত রূপে উপস্থাপন করেন, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্ব তুলে ধরে।

আশরাফুল মনে করেন, শিল্পের পবিত্রতা বস্তুবাদী আকাঙ্ক্ষায় কলুষিত হওয়া উচিত নয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রক্ষা ও নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণে তিনি বিশ্বাসী। নীরব ও প্রজ্ঞাবান এই শিল্পীর কাছে শিল্প একটি চলমান যাত্রা—বিষয় বদলালেও তাঁর স্বতন্ত্র শৈলী অটুট থাকে।

চন্দ্র শেখর দে একজন বহুমাত্রিক শিল্পী, যিনি তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনে নানা শৈলী ও প্রকাশভঙ্গি দক্ষতার সঙ্গে অনুসন্ধান করেছেন। বাস্তববাদ থেকে শুরু করে অতিবাস্তব, লোকজ, বিমূর্ত ও প্রতীকী ধারার সমন্বয়ে তাঁর শিল্পকর্মে মানবজীবনের গভীর অনুভব, রহস্যময়তা ও কাব্যিক আবহ স্পষ্ট। মুক্তিযুদ্ধ-প্রভাবিত প্রজন্মের শিল্পী হিসেবে আলো-ছায়ার নাটকীয় ব্যবহার, মানবমূর্তি ও কল্পনাপ্রসূত রূপকের মাধ্যমে তিনি বাস্তব ও কল্পনার সেতুবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাঁর কাজে সূক্ষ্ম রেখা, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও নিবেদিত শ্রম শিল্পকে দিয়েছে স্বতন্ত্র ও সংবেদনশীল মাত্রা।

হামিদুজ্জামান খান ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ভাস্কর, যিনি শিল্পজগতে নিজস্ব স্বতন্ত্র পথ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর শিল্পকর্মে রূপ, বিষয়বস্তু ও বৈচিত্র্যের স্পষ্ট স্বাক্ষর দেখা যায়। তাঁর অধিকাংশ ভাস্কর্য হয় শৈল্পিকভাবে রূপান্তরিত মানবাকৃতি (নারী ও পুরুষ উভয়ই) অথবা বিমূর্ত রূপে নির্মিত। তিনি রঙিন স্টিল, কংক্রিট, গ্রানাইট, প্লাস্টার অব প্যারিস, লোহা, ব্রোঞ্জ, সাদা গ্রানাইট, কালো মার্বেল, ক্যারারা মার্বেল, গোলাপি গ্রানাইট, সবুজ ও সাদা মার্বেলের সংমিশ্রণ, সিমেন্ট এবং নানা ধরনের ধাতু ব্যবহার করেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাজ ব্রোঞ্জ মাধ্যমে নির্মিত, যেখানে তিনি বসা মানবমূর্তি, গতিশীল মানবদেহ, বিশুদ্ধ রূপ, পশু, মাছ, পাখি এবং জ্যামিতিক নকশা উপস্থাপন করেছেন। পাথরের কাজে জ্যামিতিক রূপ ও নকশার পাশাপাশি পাখি, গৃহপালিত প্রাণী এবং মানবমুখের প্রতীকী চিত্র দেখা যায়। তিনি বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত ও তিন-চতুর্থাংশ বৃত্তের নানা বিন্যাস তৈরি করেছেন, যা সৌরজগতের গ্রহসমূহের প্রতীক হিসেবে ধরা যায়। তাঁর কাজে বীজ, মূল, পত্রপল্লব এবং প্রতীকী মানবাকৃতির মতো উদ্ভিদ জগতের বিষয়ও উঠে এসেছে, পাশাপাশি নানা দেশজ রূপের ব্যবহার লক্ষণীয়।

হামিদুজ্জামান খান একজন নিবেদিত চিত্রশিল্পীও ছিলেন। তিনি চিত্রকলায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁর জলরঙের কাজ গভীরভাবে অনুপ্রেরণাদায়ী এবং পরিণত মননের পরিচয় বহন করে। কল্পনাপ্রবণ শিল্পী হিসেবে তিনি প্রকৃতির বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জগতের মধ্যে সৃষ্টির রহস্য অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর চিত্রে প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের সহাবস্থানমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে প্রাকৃতিক দৃশ্য ও শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি একীভূত হয়ে প্রকৃতির সূক্ষ্ম রঙ ও দৃশ্যাবলিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছে।

হামিদুজ্জামানের কাজের বিভিন্ন পর্যায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। তিনি রং, রেখা এবং ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের উপাদান ব্যবহার করে এক নতুন শিল্পভাষা নির্মাণ করেন। তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকর্মে রূপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা তাঁর ভাস্কর্যচর্চার প্রভাব স্মরণ করিয়ে দেয়। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক বা জলরঙ—উভয় মাধ্যমেই তাঁর চিত্রগুলো যেন প্রবাহমান স্রোতের মতো অনুভূত হয়। তিনি প্রকৃতির রহস্য ও তার নানান পর্যায় ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।

গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন ভ্রমণের কারণে তাঁর শিল্পকর্মে (বিশেষত জলরঙে) সবুজ প্রকৃতি, গ্রামীণ প্রাকৃতিক দৃশ্য, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, ঘন বন ও পাহাড়ের উপস্থিতি প্রবল। কখনো কখনো তাঁর জলরঙে ছায়া ও অস্পষ্ট অবয়ব ফুটে ওঠে। ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক চিত্রে উজ্জ্বল রঙ ও খসখসে টেক্সচারের ব্যবহার লক্ষণীয়। উল্লেখযোগ্য যে, চিত্রকলায় তিনি বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত ও সাহসী তুলির আঁচড় কাজের মূল বৈশিষ্ট্য। প্রয়োজনে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে গভীর টেক্সচারও নির্মাণ করেছেন।

আইভি জামান একজন খ্যাতনামা ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী। তিনি ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ভাস্কর্যে বিএফএ সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে ভারতের শান্তিনিকেতনে ভাস্কর্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কাঠ, সিমেন্ট, ব্রোঞ্জ, পাথর ও ধাতুতে কাজ করে নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণ করেছেন।

প্রকৃতি তাঁর শিল্পের প্রধান প্রেরণা। নদী, পাহাড়, পাখি, গাছ, বীজ ও দেশীয় রূপক তাঁর ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মে বারবার ফিরে আসে। তাঁর ল্যান্ডস্কেপ চিত্রগুলো রঙের মাধ্যমে প্রকৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরে। শৈশবে বগুড়ার করতোয়া নদীর তীরের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পচিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বুদ্ধ বিষয়ক চিত্র ও ভাস্কর্য নির্মাণেও মনোনিবেশ করেছেন।

কনক চাঁপা চাকমা আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একজন বিশিষ্ট শিল্পী। তিনি চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল থেকে উঠে আসা এবং তাঁর চিত্রকর্মে মূলত পাহাড়ি জীবনের রূপায়ণ দেখা যায়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন, তাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তাঁর শিল্পের প্রধান বিষয়।

তাঁর কাজে নরম পৃষ্ঠ, ঘন টেক্সচার এবং সচেতন স্থানবিন্যাস একটি স্বতন্ত্র শৈলী তৈরি করেছে। পাহাড়, বন, ঝুম চাষ, জলপ্রপাত, নৃত্য–সংগীত ও বৌদ্ধ দর্শনের শান্ত আবহ তাঁর শিল্পে প্রতিফলিত হয়। আধা-বাস্তব ও বিমূর্ত রীতির সমন্বয়ে আঁকা চিত্রগুলো প্রাণবন্ত ও অভিব্যক্তিময়।

কনক চাঁপা চাকমা আলোকছায়া ও রঙের ব্যবহারে ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের দ্বারা প্রভাবিত। তিনি সাধারণত আলোকচিত্রের মতো বাস্তবতা ও অতিরিক্ত সূক্ষ্মতা এড়িয়ে চলেন। রঙের স্তর ও টেক্সচারের ঘনত্বই তাঁর চিত্রভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

নব্বইয়ের দশকে ঢাকার শিল্পাঙ্গনে খ্যাতি অর্জনকারী চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ ইকবাল দার্শনিক ভাবনা ও উদ্ভাবনী চিত্রভাষার জন্য পরিচিত। তাঁর ক্যানভাসে সাধু, মরমি, প্রান্তিক মানুষ ও শিশু বারবার ফিরে আসে; সাম্প্রতিক সময়ে অবহেলিত শিশুদের জীবনই তাঁর প্রধান বিষয়।

শুরুর দিকে ইকবাল বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দিয়ে ইমপাস্টো কৌশলে রঙের ঘন প্রয়োগ করতেন। বর্তমানে তিনি ক্যানভাসের পটভূমি নির্মাণে বিশেষ মনোযোগী—৮–১০ স্তরে রঙ বসিয়ে তারপর বিষয়কে স্পষ্ট করেন। বিমূর্ত পটভূমি, নরম রঙ, ডট ও অস্পষ্ট আকার তাঁর কাজে লক্ষণীয়।

বাউল ও সাধুদের জীবনদর্শন তাঁর শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা। লাল পোশাক, জপমালা, তাবিজ, প্রাণী ইত্যাদি প্রতীকের 

মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক যন্ত্রণাকে প্রকাশ করেন।

রঞ্জিত দাস তাঁর স্বতন্ত্র শৈলী ও গভীর ভাবনানির্ভর বিষয়বস্তুর জন্য পরিচিত। ১৯৭০-এর দশকের অন্যতম প্রধান চিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সময়ে রাষ্ট্র স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব বহন করছিল এবং দেশ নানাবিধ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট ও দ্বিধার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে শিল্প ও সাহিত্য নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সজীব ধারণায় সমৃদ্ধ হয়। রঞ্জিত দাস সমসাময়িক সমাজের পরিবর্তন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

১৯৮১ সালে ভারতের বরোদার এম.এস. ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁর শিল্পচর্চা ধীরে ধীরে একটি পরিণত রূপ লাভ করে। তিনি প্রখ্যাত শিল্পী কে.জি. সুব্রহ্মণ্যমের প্রত্যক্ষ ছাত্র ছিলেন। তাঁর চিত্রকর্মে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা, আশা ও স্বপ্ন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। দীর্ঘ শিল্পযাত্রায় তিনি নিজেকে একজন নিষ্ঠাবান ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ফিগারেটিভ চিত্রকর্মে বাস্তবতার সঙ্গে সামান্য বিকৃত রূপের সংমিশ্রণ দেখা যায়। বর্তমানে তিনি মানব অবয়ব, মুখমণ্ডল ও বিভিন্ন আকারের গঠন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর ক্যানভাসে কুকুর, ঘোড়া, কাক, রাজহাঁস ও ময়ূরের মতো নানা প্রাণীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে ঘোড়া ও কুকুর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মোটিফ, যা প্রতীকী অর্থ বহন করে। এসব প্রাণীর যন্ত্রণা, আনন্দ ও অনুভূতি তিনি ব্যক্তিগত ও উজ্জ্বল ভাষায় প্রকাশ করেন।

রঞ্জিত দাস রেখা ও টেক্সচারের ক্ষেত্রে একান্ত নিজস্ব ভঙ্গি নির্মাণ করেছেন। জ্যামিতিক ও স্থাপত্যিক গঠনের মাধ্যমে তিনি অভিব্যক্তির সীমা অনুসন্ধান করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর ক্যানভাস জুড়ে প্রসারিত একটি সোজা রেখা বা বার তাঁর শিল্পের স্বাক্ষরচিহ্নে পরিণত হয়েছে। তাঁর কাজে স্ক্রিবল, রেখা, তীরচিহ্ন, ভাঙা রেখা, লুপ, কার্ল, বর্গ, ডিম্বাকারসহ নানা আকৃতির ব্যবহার দেখা যায়। রঙ, রেখা, টেক্সচার ও টোন নিয়ে তিনি বহুস্তরীয় পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন।

বৃহৎ ক্যানভাসে কাজ করতেই তিনি সর্বাধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কারণ তাঁর বিষয়বস্তু ও কম্পোজিশনের জন্য পর্যাপ্ত পরিসর প্রয়োজন। তাঁর চিত্রকর্মে অবয়ব ও শূন্যস্থানের মধ্যে এক গতিশীল সম্পর্ক তৈরি হয়, যা দৃঢ় ও প্রবাহমান তুলির আঁচড়ে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অবয়ব কখনো ক্যানভাসের কেন্দ্রে, কখনো প্রান্তে অবস্থান করলেও পটভূমি সবসময় সম্পূর্ণ বিমূর্ত থাকে। এই দুই উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জটিল, এবং রঞ্জিত দাস তা দক্ষতার সঙ্গে বজায় রাখতে সক্ষম।

শম্ভু আচার্য একজন প্রখ্যাত পটচিত্র শিল্পী। তাঁর পরিবার প্রায় ৪৫০ বছর ধরে, টানা নয় প্রজন্ম ধরে পটচিত্র চর্চার সঙ্গে যুক্ত। গাজীর পট, শ্রীকৃষ্ণ, মহররম, রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, রাসলীলা ও লোকজ সংস্কৃতিনির্ভর নানা বিষয় তাঁর চিত্রে উঠে আসে। গ্রামীণ অর্থনীতি ও পটচিত্রের ঐতিহ্যগত পরিবেশ অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও, শম্ভু আচার্য এই প্রাচীন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

পটচিত্র বা ‘কাপড়ে আঁকা ছবি’ লোককথা, পুরাণ ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শম্ভুর শিল্পকে আলাদা করে তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও সাধনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি—তাঁর কাছে ছবি আঁকা প্রার্থনার মতো। তিনি ইট, বীজ, পাথর, প্রদীপের কালি, সিঁদুর, ডিমের কুসুম, সাবুদানা, তেঁতুলের বীজ ও নানা ধরনের মাটি ব্যবহার করে নিজেই রং তৈরি করেন। তাঁর চিত্রে গ্রামীণ জীবনের সরলতা, সমতল রঙের ব্যবহার, স্পষ্ট সীমারেখা ও পূর্ণ গল্পের বর্ণনা দেখা যায়। নারীর রঙিন পোশাক, রুপার অলংকার, নদী, নৌকা, ফুল, পাখি ও মানবিক অনুভূতি মিলিয়ে তাঁর পটচিত্র আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে জীবন্ত করে তোলে।

শেখ আফজাল হোসেন-১৯৮০-এর শেষের দিকে একজন প্রখ্যাত বাস্তববাদী চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিত। সমাজ-অর্থনৈতিক বিষয়ে গভীর আগ্রহের সঙ্গে তিনি দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কঠিন জীবন বাস্তবমুখীভাবে চিত্রিত করেছেন।

জেনাইদাহে জন্ম নেওয়া আফজাল প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। তিনি প্রাথমিকভাবে ল্যান্ডস্কেপ চিত্রায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন ঋতু, নদীজীবন, গ্রামীণ দৃশ্য, কৃষি চাষাবাদ, জলের পুকুর ও মৎস্যজীবন চিত্রিত করেছেন। শহরে থাকলেও জন্মস্থান ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট।

Afzal-এর কাজের বিষয়বস্তু মূলত নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন, নদী ও গ্রামীণ দৃশ্য, যুবতীদের সৌন্দর্য, মৎস্যজীবী, নৌকাশ্রমিক, গবাদি পশু, দিনমজুর ও পারিবারিক আনন্দ। চিত্রগুলোতে চেহারার অভিব্যক্তি প্রাণবন্ত ও আনন্দময়। তিনি শিশু-মাতা সম্পর্ক, বৃদ্ধ মানুষের জীবন, পরিবারের সুখ-দুঃখও ফুটিয়ে তুলেছেন।

শেখ আফজাল একজন দক্ষ *প্রতিমূর্তি চিত্রশিল্পী*। তিনি দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্যক্তি ও সেলিব্রিটি চিত্রায়ন করেছেন। আলো ও ছায়ার সঠিক ব্যবহার তার চিত্রকর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

Artist introductions by Takir Hossain:-  এই প্রোগ্রামটি উপস্থাপন করেন তকীর হোসেন 

১৯৭৫ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ২০০০ সাল থেকে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখছেন। তাঁর গভীর আগ্রহের ক্ষেত্র হলো শিল্প ও সাহিত্য। একজন শিল্প সমালোচক হিসেবে তাঁর সমালোচনামূলক লেখা বহু খ্যাতনামা শিল্পীর বই, ব্রোশিওর, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্প জার্নাল, জাতীয় ইংরেজি দৈনিকসহ বিভিন্ন সৃজনশীল প্রকাশনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে মূল বক্তৃতা উপস্থাপন করেছেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন শিল্প প্রতিযোগিতা ও কার্নিভালে বিচারকের ভূমিকায় সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর উজ্জ্বল কর্মজীবনে তিনি ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত বহু আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কভার করে।

একটি চিত্রকর্ম শুধু চিত্রকর্মই নয়। এর মাধ্যমে দেশ,  মানুষ দেশের মানুষের পরিস্থিতি,  মনের খোরাক, দর্শনার্থীর বিনোদন, অনুকূল / প্রতিকূল  সব কিছুই প্রকাশিত হয়। 

যার মাধ্যমে  চিত্রকর এবং চিত্রকর্মের বিষয় বিস্তারিত তথ্য আমরা  যানতে পারি।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।