স্বভাবতই চিত্রশিল্পীরা চিত্রকর্মের দ্বারা রূপদান করতে চায় প্রতিপালিত স্মৃতি কে, গুরুত্ব কে, ভালো লাগার বিশেষ উপাদানকে এবং তা কৌশলে লেপন করে ক্যানভাসের দেয়ালে যা রূপ নেয় অনন্য সুষমায়। আর ঠিক তেমনিভাবে উপচে পড়া পুরু রঙের আস্তরণে অবহেলিত কোলাহলপূর্ণ বসতি, নদীর বুকে ভেসে থাকা মেরামত করা নৌকা, জংলী ফুল, সূক্ষ্ম মৃত পাতা, আটি বাধা কাঁশফুলকে প্রধান চরিত্র দান করেন শিল্পী, শিল্পচর্চাকারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সহিদ কাজী তার “ইম্পাস্ত” শিরোনামের একক প্রদর্শনীতে, যা প্রদর্শিত হচ্ছে ৫ ডিসেম্বর হতে ঢাকার লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারী তে, চলবে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ইউরোপীয় তথা রেনেসাঁ ও ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের ব্যবহৃত জনপ্রিয় ইম্পাস্ত কৌশলে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণমূলক চিত্রকর্ম নির্মাণের মাধ্যমে সারা বছর জুড়ে যে চিত্রকর্ম তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তেলরং এর গভীর প্রলেপে ও তারই প্রেক্ষাপটে প্রদর্শনীর নামকরণ করেছেন “ইম্পাস্ত”। এটি মূলত ঘন ও পুরু করে পালেট নাইফ বা ব্রাশের প্রলেপণ যার গভীরতায় ফুটে উঠে ছায়াতল ও সৃষ্টি করে ত্রিমাত্রিক ব্যঞ্জনা। ইতালীয় এই শব্দ “ইম্পাস্ত” অর্থ হলো “পেস্ট” বা “মাখানো” অর্থাৎ সারফেসের দেয়ালে চেপে চেপে রঙের প্রলেপণ, যার প্রধান মাধ্যম হলো তেলরং। অন্যান্য মাধ্যমেও এই কৌশল প্রয়োগ করা গেলেও তেলরং এর চাকচিক্যে চিত্রের আভিজাত্যতা দ্বিগুণ হয়ে পড়ে। আর এই কারণেই রেনেসাঁ, ইম্প্রেশনিস্ট, অভিব্যাক্তিবাদী ও বিমূর্তবাদী শিল্পীদের কাছে এই পদ্ধতি সমাদৃত ছিলো। শিল্পী কর্ডেলিয়া উইলসনের টাওস মাউন্টেন, ভ্যান গগের স্টেরি নাইট,জেন ফ্রাঙ্কের ক্র্যাগস অ্যান্ড ক্রেভিসেস এর মত বিখ্যাত চিত্র কর্মেও এই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল।
আমেরিকান চিত্রশিল্পী জ্যাকসন পোলকের ভাষায় “শিল্প হলো তুমি যা দেখো তা নয়, বরং তুমি যা অন্যদের দেখাও”। শিল্প শিল্পীর সৃষ্টি মাত্রই নয় শিল্প হলো অনুভবের উপকরণ যা একটি দর্শকের মনে ধরা দিবে প্রকৃতির উপাদানগুলোর দৃশ্যমান পটের ভিতর সমাহিত শিল্পীর অধ্যাবসায়, চর্চা, পর্যবেক্ষণ, মনের চঞ্চলতা, আবেগ – উত্তেজনা, চেতনা ও কল্পনা। ভূমি গ্যালারীর প্রতিটি কক্ষ জুড়ে আলোছায়ার উত্তম কৌশলের মাঝে বিরাজ করেছে চিত্রকর্ম গুলো, যা শিল্পীর মনের চেতন-অচেতন ভাবনার, অনুভূতির, তুচ্ছের প্রতি ভালোবাসার, উত্তেজনার আর জীবনের গতিময়তার রচনা সৃষ্টি করেছে।

প্রদর্শিত চিত্রগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে চিত্রশিল্পী সহিদ কাজী তার “ড্রাই কাঁশ ফ্লাওয়ার ইন লেট অটমন” চিত্রকর্মের স্মৃতিচারণে স্পষ্টতই উল্লেখ করেন মৃতপ্রায় কাশবনের সৌন্দর্যের অন্বেষণে বহুবার ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ, উপলব্ধি ও অনুভূতির প্রকাশেই এটির নির্মাণ। চিত্রটি আপাত দৃষ্টিতে অর্ধবিমূর্ত পরিলক্ষিত হলেও পুরু রঙের প্রলেপণ এটির বিস্তারিত রূপ ফুটিয়ে তুলে যা প্রকাশ করে প্রকৃতির সৌন্দর্য, নির্দিষ্ট মুহূর্ত ও এর সাথে জড়িয়ে থাকা শ্রমজীবীদের শ্রম। প্রকৃতির সাধারণ দৃশ্য যেন শিল্পীর তুলিতে অসাধারণ হয়ে পড়েছে।

গ্যালারীর আরেকটি কক্ষে টাঙ্গানো “এ অলমোস্ট ডেথ অফ রোজ ফ্লাওয়ার” চিত্রকর্মের কৌশলে বর্ণ প্রয়োগের ক্ষেত্রে গভীর পর্যবেক্ষণের কথাও উল্লেখ করেছেন শিল্পী। একাধিক মাসের অপেক্ষায় শুকোনো রং গুলোর দ্বারা সৃষ্ট এ চিত্রকর্ম এর গভীরতায় ঢেকে যাওয়া নিরালোক পরিবেশ মনের ভেতরের অন্ধকারে কুড়ে খাওয়া সংশয়, দ্বিধাবোধ এর প্রকাশও ঘটায়। গাঢ় সবুজের ঘন ছায়াযুক্ত কম্পোজিশনের উপর উপচে পড়া লাল হলুদ গোলাপের মৃতপ্রায় পাপড়ি যেন ফুটিয়ে তুলে জীবনের ঘনিয়ে আসা হতাশা পেড়িয়ে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব যদি থাকে শক্তি ও আশার আলো।

তিনি তুচ্ছ ও পড়ে থাকা বস্তুর প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করেন আর সেটি তার “রোডসাইড ফ্লাওয়ারস” শীর্ষক শিল্পকর্মের দ্বারা প্রকাশ পায়। নিজের ভাষায় বলেন ভ্রমণকালে চোখে পড়া সেই রাস্তার ধারের ফুলটি তাকে মায়ায় ফেলে দেয়। এই মায়া প্রকৃতির প্রতি ফেলে দাওয়া, বর্জন করা, অসহায় উপাদানের প্রতি মায়া। অসংখ্য লতা পাতায় জড়ানো জীর্ণশীর্ণ স্থানে জন্মে ওঠা জংলি ফুলটি বহন করে বাঁধনহারা স্বাধীনতা, প্রতিকূলতার মাঝেও টিকে থাকা এবং প্রকাশ করে সরলতা ও পবিত্রতা। ঝোপঝাড়ের মাঝে শুভ্রতা ছড়ানো ফুলটি প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে বিকশিত হয় যা সৌন্দর্য ও জীবনশক্তির প্রতীক রূপে বিকশিত হয় প্রতিকূল বন্য পরিবেশে এবং নতুন জীবন ও আশার সঞ্চার করে।

পৃথিবীর সেরা এবং সুন্দর জিনিসগুলো দেখা যায় না এমনকি স্পর্শও করা যায় না, সেগুলো হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। তার প্রমাণ যেন শিল্পীর সৃষ্ট “ফিশিং বোট এট আড়িয়াল বিল” শীর্ষক চিত্রকর্মটির দ্বারা প্রকাশ পায় যা পার্শ্ববর্তী বার্ডস আই ভিউ পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট। শিল্পী বিলের সৌন্দর্যের সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন মাছ ধরার মুহূর্তে চারপাশের পরিবেশ। যেখানে বর্ষার সকালের অথৈ জলরাশি আর সবুজ কচুরিপানার সমারোহে ভাসমান ডিঙ্গি নাও যার উপরে পরে আছে জেলেদের মাছ ধরার জাল । নদীর পানির তরঙ্গ, উপরে আকাশের প্রতিবিম্ব ও কচুরিপানার যোগসূত্রের দৃশ্য প্রকাশ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্মলতা, জীবন্ত পরিবেশ এবং স্থিরতা ও গতিশীলতার সহাবস্থান। জন্মসূত্রে মুন্সিগঞ্জের চিরচেনা এই বিল তার স্মৃতির পাতায় সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে ।
বাস্তবতার নিখুঁত চিত্রের অনুপস্থিতি এবং আলো ও রঙের ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তনের উপস্থিতি ও নির্দিষ্ট মুহূর্তের অনুভূতির প্রকাশ পোস্ট ইমপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য, আর এই বৈশিষ্ট্য যেন শিল্পী সহিদ কাজীর প্রায় প্রতিটি চিত্রকর্মে ফুটে তুলেছেন। যেন তিনি দারুনভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন এই ধারার দ্বারা। যেখানে প্রকৃতির সান্নিধ্য, খোলা আকাশের নিচ বা শহুরে দৃশ্যের ঝলক, আলোর খেলা এবং গতিশীলতাই প্রধান বিষয়। প্রাণবন্ত ও ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির মতো শিল্পকর্মগুলোর দৃশ্যমান ব্রাশস্ট্রোক, পরিবর্তনশীল আলো ও ছায়া এবং সাধারণ বিষয়বস্তুর ওপর জোর দেয়া দর্শকদের মনে তাৎক্ষণিক ছাপ বা ইম্প্রেশন তৈরি করে এবং দর্শকদের শিল্পীর অনুভূতির সাথে যেন মিশে যেতে সাহায্য করে।