সমাজের অংশ হিসেবে শিল্পীরা তাদের দায়িত্ববোধ থেকেই নৈতিক ও শিক্ষণীয় চেতনায় শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে। আর এই সৃষ্ট শিল্পকর্ম জনসাধারণের মাঝে তৈরি করে উৎকণ্ঠা ও চৈতন্যবোধের। ল্যাটিন সাহিত্যিক হোরেস তার ‘আর্স পোয়েটিকা’ গ্রন্থে বলেছেন- “শিল্প শুধু আনন্দ দেয় না, শেখায়ও”। তাইতো সমাজের বিভিন্ন ঘটনা, সত্যতা, শিক্ষামূলক এবং নীতি ও নৈতিকতার বিষয়াবলীকে কেন্দ্র করে শিল্পীরা শিল্প নির্মাণ করেন। যা দেশ ও সমাজের কল্যাণে সাবধানতা ও সচেতনতার বার্তা প্রচার করে ।
শিল্পজগতে এই প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে চিত্রশিল্পের এক বিশেষ শৈলী ব্যবহার হয়ে আসছে, যাকে বলা হয় “ব্যঙ্গচিত্র” বা “কার্টুন”। এটি হলো হাস্যরসাত্মক বা ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে নির্মিত উত্তেজক ও অতিরঞ্জিত চিত্র। যার উদ্দেশ্য দর্শকের মনে বিনোদনের খোরাক মেটানোর সাথে সাথে সমাজের সত্য চিত্র তুলে ধরা। এসকল অতিরঞ্জিত চিত্র দর্শককে হাসাতে ও ভাবতে সাহায্য করে। সাধারণত সংবাদ পত্র, ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে সংক্ষিপ্ত বার্তা হিসেবে এগুলোর ব্যবহার করা হয়।
এই ব্যঙ্গচিত্র ১৭০০ সালের দিকে ক্যারিকেচার বা বিকৃত চিত্র হিসেবে ইতালি তে প্রথম শুরু হয়েছিলো এবং এটিকে রাজনৈতিক কার্টুনের অগ্রদূত মানা হতো। ১৮৪৩ সালে জন লিচ দ্বারা এর নাম প্রবর্তন হয়েছিলো ‘কার্টুন’। পরবর্তীতে ১৯০০ সালের দিকে এটি আরো আধুনিকতার ছোঁয়া পায়। বাংলায় ব্যাঙ্গচিত্রের শুরু হয়েছিলো ১৯ শতকের শেষের দিকে গিরিন্দ্রনাথ দত্ত ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। ‘বসন্তক’ পত্রিকার মাধ্যমে শুরু হয়েছিলো এর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা, যা ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা, সামাজিক অসঙ্গতি ও রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ব্যঙ্গাত্মক চিত্রায়ণে ঘটিয়েছিলো। বর্তমানেও সকল ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনাবলীর আলোচনা সমালোচনার মাধ্যম এই কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র টিকে আছে। শিল্পী কাজী আবুল কাসেম, কামরুল হাসান, রফিকুন নবী সহ বহু শিল্পী ও সংস্থা এই মাধ্যম নিয়েই কাজ করছেন।
৯ ডিসেম্বর “বিশ্ব দুর্নীতি দমন দিবস” হিসেবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০ তম “দুর্নীতি দমন কার্টুন প্রতিযোগিতা” এর আয়োজন করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তরুণ প্রতিযোগীদের মধ্যে দুর্নীতি দমনের মূল্যবোধ ও তাৎপর্য ছড়িয়ে দেওয়া। “দুর্নীতি ও মানবাধিকার” বিষয় যুক্ত এই প্রতিযোগিতায় ১৯৯ অংশগ্রহণকারীদের ৪১০ টি চিত্রকর্ম পর্যবেক্ষণের পর, ৪০টির ও অধিক শিল্পকর্ম নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিযোগিতাটিতে দুটি গ্রুপের মোট ৬টি এবং বিশেষ ২টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
জয়নুল গ্যালারীর ২টি কক্ষে পাশাপাশি ভাবে সজ্জিত ব্যঙ্গচিত্র গুলো- বাংলাদেশের সামাজিক অবক্ষয়, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাষ্ট্রীয়ভাবে নাগরিক কে তার অধিকার প্রদানে ব্যর্থতা, বৈষম্য ও দুর্বল আইনের চিত্র ইত্যাদি বিষয়কে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। আরো বিশ্লেষণাত্মকভাবে ঘুষ, চাঁদাবাজি, আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও স্বার্থের সংঘাত ইত্যাদি প্রদর্শনীর প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে পরিলক্ষিত হয়েছে। অর্থাৎ গ্যালারীর দেয়ালে দেয়ালে প্রকাশ পাচ্ছে এদেশের দুর্নীতির চরম অবস্থা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দুর্দশাগ্রস্ত সমাজচিত্র।

মাওলানা ভাসানী বলেছিলেন “দুনিয়াতে যত বড় অন্যায় আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অন্যায় হলো মানুষের উপর মানুষের শোষণ।” এই শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র রচনা করেছেন গ্রুপ এ তে ২য় পুরস্কারপ্রাপ্ত মো: আরাফাত ইসলাম সিফাত। তার চিত্র রচনার মূল বিষয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। নিত্যদিনের বাজারের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম আগুনের লেলিহান শিখার মতোই বেড়ে চলছে। আর বাড়ছে অবৈধ মজুতদারি, বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি, এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। ফলে সমাজের সকল স্তরের মানুষের, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন হয়ে পড়েছে দুর্বিষহ এবং সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক বৈষম্য ও অস্থিরতা । এসকল সমস্যার সমাধান খুঁজতে শিল্পী প্রশ্ন তুলেছেন সকলের কাছে।

গ্যালারীর আরেকদিকে সমাজের দুর্নীতি হ্রাসের উদ্দেশ্যে “দুদক” (দুর্নীতি দমন কমিশন) এর দুর্নীতির বিষয় তুলে ধরেছেন গ্রুপ ‘এ’ তে ১ম পুরস্কারপ্রাপ্ত অংশগ্রহণকারী শিল্পী মিফতাহুজ্জামান সেন। অন্তর্নিহিত দুর্নীতি তথা দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্বারা সংঘটিত অনিয়ম দুদকের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এবং এর কার্যকারিতা হ্রাস করে। আর এই ভাবমূর্তির বিনাশপ্রাপ্ততাই মিফতাহুজ্জামান এর চিত্রের প্রধান বিষয়। প্রতিবাদ স্বরূপ এই চিত্রকর্মটি সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন সৃষ্টি করবে যা থেকেই সমাধানের প্রচেষ্টা অঙ্কুরিত হবে।

নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন “শিক্ষা সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা দিয়ে বিশ্বকে পরিবর্তন করা যায়।” বিশ্বের, দেশের তথা সমাজকে এগিয়ে নিতে, শিক্ষার আলোতে আলোকিত সমাজ গড়তে প্রতিনিয়ত বের হচ্ছে শত শত, হাজার হাজার গ্রাজুয়েট। কিন্তু, টাকার কাছে হেরে যাচ্ছে এসকল মেধাবী। আমেরিকার বিখ্যাত কূটনীতিবিদ ও মানবিক কর্মী এলিনর রুজভেল্ট বলেছেন “মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অপচয় হল তার মানব সম্পদ অপচয় করা।” কিন্তু এদেশের ছাত্রসমাজ সম্পদে পরিণত না হয় দেশের বোঝায় পরিণত হচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাবের সাথে সাথে উপযুক্ত কর্মক্ষেত্রের অভাব হচ্ছে। সকল কিছুর পেছনে রয়েছে দুর্নীতির কালো হাত। স্বজন-প্রীতি, ঘুষ কেড়ে নিচ্ছে ন্যায্য অধিকার। এ বিষয়ই প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে ‘এ’ গ্রুপের শিল্পী শাহমান শ্রেয়র চিত্রকর্মে। চিত্রকর্মের মূল বিষয়বস্তু হলো শিক্ষা এবং সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান বৈপরীত্য। একজন স্নাতক (গ্র্যাজুয়েট) ব্যক্তি টাকার মধ্যে ঝুলে আছেন, ঠিক যেন খ্রীষ্ট ধর্মের যীশুখ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ এর মত। প্রতীকী অর্থে ঝুলে থাকা স্নাতক ব্যক্তি সমাজের সেই শিক্ষিত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা ডিগ্রি অর্জন করেও উপযুক্ত কাজের সুযোগ পান না বা সমাজে যথাযথ সম্মান পান না।
এছাড়াও প্রদর্শনীতে ফুটে উঠেছে সমাজের অন্যান্য প্রেক্ষাপট। কোনো চিত্রে ফুটে উঠেছে স্বার্থান্বেষী মহলের লুটপাট, ভোগবাদ ও আয়েশি জীবনযাপন। আবার কোনো চিত্রে ফুটে উঠেছে দুর্নীতির কালোচ্ছায়ার কবলে পড়া শাসনব্যবস্থা। ফুটে উঠেছে গরিবের ন্যায্য অধিকার হরণের চিত্র। শিল্পী ফিহা হাসানের ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করেছে মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ে হেরে যাওয়ার চিত্র। দাঁড়িপাল্লার একপ্রান্তে কালো টাকা আর আরেক প্রান্তে ভুক্তভুগী সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, হেরে যাচ্ছে দুর্নীতির কাছে। ক্ষমতার বলে অসৎ ব্যক্তিরা সমাজে সৃষ্টি করছে অরাজগতা। গ্যালারীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে হাস্যরসাত্মক ব্যঙ্গচিত্রের দ্বারা আরো ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, ক্ষমতার লোভ, নিঃস্ব মানুষের উপর অত্যাচার, আমলাদের আত্মসাৎকরণের চিত্র। দেয়ালের কোনো কোনো চিত্রে পোশাক শিল্প, হাসপাতাল, অফিস, আদালতের দুর্নীতি, ভোগবাদ, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করা, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতিগ্রস্ততা, উঁচুনিচু ও শ্রেনী ব্যবধান ইত্যাদি বিষয়াদি ফুটে উঠেছে।
সচেতনতামূলক এই প্রদর্শনীটি চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারী গত ৯ ডিসেম্বর থেকে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এর মূলমন্ত্র ছিলো এই দেশের বুকে যত প্রতিকূলতা আসুক না কেন, আশাবাদী তরুণ সমাজ চায় ন্যায়নীতি ও শিক্ষার আলোকে আলোকিত হবে এইদেশ।