(প্রথম প্রকাশঃ চারুকলা, প্রথম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, ডিসেম্বর ১৯৯৪)
ঐতিহ্যগতভাবে নগর হচ্ছে সভ্যতা ও ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু। নগরের বিজয় গৌরব এককালে জনগণের প্রাণে সঞ্চার করেছিলো সশ্রদ্ধভীতি, তাদের অধিপতিদের দিয়েছিলো কর্তৃত্ব। এই নগর কালক্রমে হয়েছে লিপিবদ্ধ ইতিহাসের বাহক, জ্ঞানের ভান্ডার ও আইন কানুনের সংরক্ষনাগার।
‘ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় ঢাকা নগরীর বেড়ে ওঠার ঘটনাবলী অতি চমকপ্রদ। নগরায়নের পূর্বলগ্নে স্থানটি ‘ঢাক’ গাছে পরিপূর্ণ ছিলো। স্থানীয়ভাবে ‘পলাশ’ ‘ঢাক’ গাছের নামান্তর মাত্র। বঙ্গজনপদের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ‘বিক্রমপুর’ ‘সোনারগাঁও’ যে সময়ে ইতিহাসে প্রাধান্য পেয়েছিলো ঠিক সে সময়ে মধুপুর গড় অঞ্চলের সর্বোচ্চ নদী তীরবর্তী স্থান ছিলো এটি। এ অঞ্চলের বাণিজ্য ও পরিবহনের কেন্দ্রবিন্দুও ছিলো এখানে। তাই গুপ্ত শাসনামলের সমতটের ডবাক এলাকার নদীপথ পাহারায় বুড়িগঙ্গা নদীরতীরে অবস্থিত ‘ঢক্কা’ মানমন্দির কার্যকর ছিলো। ‘ঢাক’ গাছে পরিপূর্ণ, মানমন্দিরটিকে নগরায়নের প্রথম প্রয়াস বলা যেতে পারে। এসব ঘটনা ঘটেছিলো নবম শতকের পূর্বে। পরবর্তীতে ‘ঢক্কা’ নাম থেকে ঢাকা নামের উৎপত্তি হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে বিভিন্ন সময়ে চন্দ্ররাজ বংশ, পালরাজ বংশ, বর্মণরাজ বংশ ও সেনরাজ বংশীয়দের অধীনে ছিলো এ স্থান। ত্রয়োদশ শতকে সেনরাজারা বৌদ্ধধর্মের বদলে হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন ও হিন্দু দেবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য প্রচার করেন। কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতীক উর্বরা মাতৃদেবী ‘দুর্গা’ নামে ‘ঢক্কার’ বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়, ‘ঢাক’গাছে পরিপূর্ণ বনাঞ্চল পরিষ্কার করে ‘ঈশ্বরী’ বা মাতৃদেবীকে দেবালয়ে রাখা হয়। দিনে দিনে এ দেবালয় ‘ঢাকেশ্বরী’ মন্দির নামে পরিচিতি পায়। কালক্রমে ‘ঢক্কা’র ‘ঢাক’ গাছে পরিপূর্ণ এলাকার মন্দিরের নাম প্রচারের মধ্য দিয়ে তথা ‘ঢাকেশ্বরী’র মাধ্যমে ‘ঢক্কা’ ঢাকা নামে রূপান্তরিত হয়। ঢাকা তখনও নগবরূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি।
ঢাকেশ্বরী দেবালয ঘিরে নিকটবর্তী গ্রামাঞ্চলের উৎপাদকেরা একত্রিত হতো। যার যা প্রয়োজন তা পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে আদান প্রদান ও সরবরাহ করতো। ফলে উৎপাদকেরা নিজস্ব সমস্যা যথা-দুর্যোগ মোকাবিলার মাধ্যম, আনন্দ বিনিময়ের ক্ষন নিয়ে এখানে আলোচনা করতো ও নির্ধারণ করতো। এভাবে ধীরে ধীরে দেবালয়কে কেন্দ্র করে একটি বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। এ দেবালয়ের কর্তৃত্ব পেয়ে স্থানীয় ব্যবসা, খাদ্যদ্রব্যের ও সংস্কৃতির ধারক হলেন সেনরাজারা। কিন্তু একাদশ শতকের বঙ্গজনপদ- বাণিজ্যনগরী সোনারগাঁও দেববাজাদের করতলগত হওয়ার ফলে সেনরাজারা বন্দর নগরী সোনারগাঁও থেকে বিতাড়িত হয়। সেনরাজাবা ঢাকাকে নতুন বাণিজ্যকেন্দ্র রূপে আবিষ্কার করে ও প্রতিষ্ঠত করে। ঢাকা এভাবে বাণিজ্য বন্দর হিসেবে চিহ্নিত হয় ইতিহাসে। নগরায়নের এ ধাপ অতিক্রম করার পরপরই উত্তর ভারতের মুসলমান শাসকদের হাতে সেনরাজারা পরাজিত হয়। ফলে ঢাকার নগরায়নে ধীর গতি দেখা দেয়।
সোনারগাঁয়ের প্রথম স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারকশাহ বিতাড়িত হয়ে মেঘনার পশ্চিমকূলে বনাঞ্চলে আশ্রয় নেন। ইতিহাস সূত্রে জানা যায় যে, তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরের অদূরে ইকলিম মোবারাকাবাদ তোরণ নির্মাণ করেন। যদিও মোবারাকাবাদের সঠিক স্থান আজও নির্ণয় করা সম্ভবপর হয়নি তবু এর তোরণের ভিত্তিপ্রস্তরের স্থান ঢাকাতেই। তোরণটি ১৪৫৯ সালে সংস্কার করা হয়েছিলো। ঢাকা মহানগরীর ক্রমবিকাশের ইতিহাসে এসব ঘটনা ও পঞ্চদশ শতক অতি গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার প্রাচীনতম মসজিদ ১৪৫৬ সালে নারিন্দায় নির্মিত হয়। এর নির্মাতা মারহামাতের কন্যা বখত বিনাত্। এ মসজিদ ও এর নির্মাতার নাম প্রমাণ করে যে মুসলিম শাসনামলে নারিন্দায় জনবসতি গড়ে উঠেছিলো। দেবালয় বা ঢাকেশ্বরী এলাকা ঘিরে যারা বসবাস করতো তারা সে সময়ে স্থায়ী বসবাস এলাকা গড়ে তোলে ও পেশাভিত্তিক এলাকায় বাস করতে শুরু করে। এ সময়ে বণিকেরা বাংলাবাজারে, তাঁতীরা তাঁতীবাজারে, কারুশিল্পীরা শাঁখারীবাজারে ও ধর্মান্তরিত যুদ্ধবন্দীরা নারিন্দায় বাস করতে থাকে। নবাগতদের প্রাধাণ্য নারিন্দাতেই পরিলক্ষিত হয়- মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে। ১৪৬০ সালে সুলতান বারবাকশাহের আমলে ঢাকা একটি রাজস্ব সংগ্রহের স্থান ছিলো ও একাজের জন্য একজন কাজী নিযুক্ত হয়েছিলেন। নগর রূপে বেড়ে ওঠার ধাপ হিসেবে এগুলো চিহ্নিত হতে পারে। ১৫৫০ সালের (আনুমানিক) জ্যায়োদো বারোসের মানচিত্রে ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত- দেখনো আছে। আকবর-নামায় ঢাকা একটি থানা হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। মোগল আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে ঢাকাকে দুর্গ দিয়ে সুরক্ষিত করার কথা ইতিহাসে রয়েছে। এ সময়ে দোলাইখালের দুইতীরে গেন্ডারিয়ায় দু’টি দুর্গ নির্মাণ করা হয়। মোগল বিজয়ের পর পরই ঢাকা শহরের পরিধি, সম্পদ ও জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। সুবেদার ইসলাম খানের সাথে ৫০,০০০ লোকলস্কর ঢাকায় হাজির হয় এবং মোগল রাজধানী হিসেবে নামান্তরিত হয় ‘জাহাঙ্গীর নগর’ নামে। ঢাকা নগরীর আসন পায় মোগল আমলের শুরুতে। ‘জাহাঙ্গীর নগর’ নাম ইতিহাসে স্থায়ী আসন পায়নি। ঢাকা নামেই ঢাকা মহানগরী ইতিহাসে বেঁচে আছে।
মোগলদের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকা বেশ কয়েকটি কারণে চিহ্নিত হয়েছিলো। এর অবস্থানের সামরিক গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। এখান থেকে নদীপথে দক্ষিণপূর্ব বাংলার যে কোনো স্থানে অল্প সময়ে পৌঁছানো যেতো অথচ নিয়মিত বন্যার কবল থেকে স্থানটি ছিলো মুক্ত। তাই দক্ষিণপূর্ব বাংলার বার ভূঞাদের ক্ষমতা নষ্ট করে স্থায়ী মোগল আধিপত্য বিস্তাবের লক্ষ্যে ১৬০৮ সালে সুবেদার ইসলাম খান ঢাকার চাঁদনীঘাটে অবতরণ করেন। তাঁর সাথে এলেন সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী, দেওয়ানী ও অন্যান্য দফতর। সুবেদারের বাসস্থান হলো আধুনিক জেলখানা এলাকার পুরানো কেল্লায়। সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাসস্থান হলো কেল্লা সংলগ্ন এলাকার বাহিরে উর্দুবাজারে সেনাছাউনি বাড়ানো হলো। নবাগত কর্মচারীদের পরিচয়ে নতুন এলাকা নাম পেলো যা আজও দেওয়ানবাজার, বকসীবাজার, মাহুতটুলী, কায়েতটুলী নামে পরিচিত। পুরানো ঢাকার পরিধি বেড়ে গেলো অনেক, ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলো, অনেক শস্যের প্রয়োজন হলো। প্রয়োজন হলো কামার, কুমার, শিল্পীর। চারপাশ থেকে সব জোগাড় করা হলো। নগরীকে সুরক্ষিত করার প্রয়োজন দেখা দিলো। এসময় নগরীর বেশীরভাগ স্থানীয় জনসাধারণ ছিলো হিন্দু।
১৬৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানী হিসেবে বহির্বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। বহু বিদেশী বণিক-পর্যটক ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁদের বর্ণনা থেকে ঢাকার তৎকালীন বিবরণ পাওয়া যায়। ১৬৪০ সালে পর্তুগীজ ধর্মযাজক সেবাষ্টিয়ান মানরিক ঢাকায় আসেন। তাঁর কথায়, “এক ধারে নদীকে রেখে এ শহর বেড়ে গেছে প্রায় সাড়ে চার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে। পশ্চিমে মানেশ্বর, পূর্বে নারানদিন (নারিন্দা) আর উত্তরে ফুলগাড়ী (ফুলবাড়িয়া) পর্যন্ত এ শহর বিস্তৃত। বণিজ্যের উদ্দেশ্যে কত বিদেশী বণিকেরাই না ঢাকায় আসেন। ঢাকার আশেপাশের উর্বরা জমিগুলোতে ফসলের প্রাচুর্য্যের ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দারুণ ব্যবসা করেন। এদের মধ্যে অনেকেই যেমন কাটাবিয়া (ক্ষত্রিয়) এত বিত্তশালী যে তাঁদের অর্থসম্পদ হাতে না গুণে পাল্লায় ওজন করতে হয়। আমি আরও খবর পাই যে শহরের স্থানীয় লোকসংখ্যা প্রায় দুই লক্ষের মতো। এছাড়াও আছে ইউরোপীয় ও অন্যান্য ব্যবসায়ী ও ভিন্ন পেশার মানুষ। এখানকার বাণিজ্য এতই অধিক যে প্রতি বছর প্রায় শতাধিক বড় বড় জাহাজ নানা ধরনের পণ্য ও খাদ্যদ্রব্য নিয়ে এখানকার বন্দর থেকে বাইরে যায়।”
ছোট্ট বাণিজ্যকেন্দ্র ঢাকা মোগল সাম্রাজ্যের শক্তি ও সম্পদের সংস্পর্শে এসে অতি অল্প সময়ের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ নগরে উন্নীত হয়। আর এই নগর থেকে মহানগরীতে উত্তরণ ঘটে আরো দ্রুত গতিতে। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে ট্যাভারর্নিয়ার ভ্রমণে এসে বলেন, “ঢাকা একটি বিরাট শহর। প্রায় ছয় বর্গমাইল জুড়ে বিস্তৃত। এর সীমারেখা ধরা হয় দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদী আর উত্তরে টঙ্গী, আর পশ্চিমে মীরপুর থেকে পূর্বে পোস্তগোলা পর্যন্ত।” বলা হয়, মোগল ঢাকা যখন খ্যাতি ও সমৃদ্ধির তুঙ্গে তখন এর বিস্তৃতি ছিলো ৪০ বর্গমাইল জুড়ে আর জনসংখ্যার কথা বলা হয় নয় লক্ষ। সে হিসেবে সপ্তদশ শতাব্দীতে ঢাকা ছিলো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ মহানগর এবং নিঃসন্দেহে একটি জনাকীর্ণ শহর।
মোগল ঢাকায় যদিও নানা ধর্মের লোক, যেমন- মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন এবং শিখগণ বসবাস করতেন তবু রাজধানীর সাংস্কৃতিক ও নাগরিক জীবন বেড়ে উঠেছিলো প্রধানত ইসলামী-বিশেষ করে মোগল প্রভাবে। মোগল সুবাদার, আমীর ওমরাহ ও ধর্মভীরু মুসলমানেরা সুউচ্চ গম্বুজসহ মসজিদ নির্মাণ করেন। মোগল শিল্প ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সম্বলিত বড় কাটরা, ছোট কাট্রা ও লালবাগ কেল্লার অসমাপ্ত রূপ, পরী বিবির মাজার, লালবাগ মসজিদ, শাহবাজখানের মসজিদ, খান মুহম্মদ মৃধার মসজিদ, বেগমবাজার মসজিদ, প্রভৃতি আজও জনমনে তৎকালীন ঢাকার জমকালো জীবনের কথা স্মরণ করায়। সুবেদার শায়েস্তাখানের সময়কালকে ঢাকার ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করা হয়। বলা হয় যে, সেসময় টাকায় আটমন চাউল কেনা যেতো।
বিরতিহীনভাবে প্রায় একশত বছর ধরে মোগল ঢাকা গড়ে উঠেছিলো। এই বিশাল নগরীর মূল বাসস্থান নদী তীরবর্তী এলাকাকে কেন্দ্র করে বেড়ে উঠেছিলো। নগবাধ্যক্ষ কোতোযাল নামে পরিচিত ছিলেন। শহরের প্রধান সড়ক ছিলো মাত্র দু’টি। একটি পূর্বে নারিন্দা থেকে আরম্ভ হয়ে নদীপথ সমান্তরালে এঁকে বেঁকে পশ্চিমে লালবাগে শেষ হয়, অপরটি দক্ষিণে সদরঘাট থেকে শুরু হয়ে নবাবপুর দিয়ে তেঁজগাও চলে যায়। এসব প্রধান সড়ক থেকে আশে পাশে অনেক ছোট রাস্তা ও গলি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। সে যুগে যানবাহনের ব্যবস্থা ছিলোনা, তাই বড়ো রাস্তার খুব বেশী প্রয়োজন ছিলো না। সাধারণ লোকজন পায়ে হাঁটতো। আর অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা ঘোড়ার পিঠে বা পাল্কিতে চলাফেরা করতেন। ছোট গলির ভেতরের বাড়িগুলো তাই প্রায় রাস্তার ওপরেই নির্মিত হয়েছিলো। বাড়িগুলো ছিলো খড়ের ছাউনী আর বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি। বেড়ার ওপরে মাটির প্রলেপ দেয়া হতো। বিত্তবান ব্যক্তিরা আধাপাকা বাড়িতে থাকতেন। কাঁচা রাস্তায় শীতকালের ধুলো আর বর্ষাকালের কাদা শহুরে জীবনকে কঠিন করে তুলতো। সুবাদার আযম খানের সময়ে (১৬৭৮-৭৯) রাস্তাগুলোকে ইট দিয়ে তৈরী করা হয়। এসময়ে বিশ্ববিখ্যাত মসলিনের জন্য ঢাকা খ্যাতি অর্জন করে।
‘প্রাচ্যের রাণী’ বলে পরিচিত ঢাকা শহরের সমৃদ্ধির ফাটল ধরল ১৭০২ সালে। প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার জন্য দিউয়ান মুর্শিদকুলী খান তাঁর দফতর মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। পরে তিনি সুবাদার হয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যান। রাজধানীর মর্যাদা হারালেও বাণিজ্যিক মর্যাদা ঢাকার জন্য অব্যাহত থাকে। এ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইউরোপীয়রা তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ঢাকাতে অনেক বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ব্যবসায়ী হিসাবে এখানে ইরানী, তুরানী, আর্মেনিয়, পাঞ্জাবী ও মাড়োয়ারীরাও ছিলো। বাণিজ্যের ফলে ১৭৪৭ সালে ঢাকা থেকে প্রায় সাড়ে ২৮ লক্ষ টাকার কাপড় রপ্তানী করা হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষপাদে এ ধরনের আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক কোটির ঘরে। এ সময়ে ঢাকা জাঁকজমক ও সমৃদ্ধির দিক দিয়ে এক প্রাণবন্ত শহর বলে পরিচিত ছিলো। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর সারা বাংলার মতো ঢাকার বুকেও কোম্পানীর দৌরাত্ম বেড়ে যায়। দেশীয় বণিকদের উপর কর আরোপ করে কোম্পানী বেশি মুনাফা লাভ করার প্রচেষ্টা চালানোর ফলে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা স্তব্ধ ও স্থবির হয়ে যায়। একই সময়ে বাংলা বিহার উড়িষ্যার প্রশাসনিক কেন্দ্র ও বাণিজ্যকেন্দ্র কলিকাতায় স্থানান্তরিত করা হলে মুর্শিদাবাদ ভেঙে পড়ে আর প্রায় অতলে তলিয়ে যায় এতদিনে বেড়ে ওঠা ঢাকা নগরী।
তবে কালের পরিক্রমায় ঢাকার এ স্তব্ধতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৮৩০ সালে ঢাকা একটি বিভাগীয় প্রশাসনের কেন্দ্র বিন্দুতে রূপান্তরিত হয়। ১৮৩৫ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুল, ১৮৪১ সালে ঢাকা ‘কলেজ, ১৮৫৬ সালে প্রথম ইংরেজী সাপ্তাহিকী The Dacca News এর আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং ১৮৬০ সালে প্রথম বাংলা সাপ্তাহিকী ‘ঢাকা প্রকাশ’ বের হয়। এভাবে ১৮৬৪ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি, ১৮৭৪ সালে ঢাকা মাদ্রাসা, ১৮৮৫ সালে প্রথম রেলওয়ে লাইন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৫৪ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ঢাকার নবজাগরণের মূলে এক বিস্ময়কর ঘটনা। এই যুদ্ধের ফলে রাশিয়ার সাথে ব্রিটেনের সনাতনী আমদানী বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটেনের শিল্পকারখানার জন্য নানা ধরনের কাঁচামালের প্রয়োজন হয়। তারমধ্যে পাট একটি। পূর্ববাংলার মতো এতো উন্নতমানের পাট আর কোথাও পাওয়া যেতনা। সেই বাণিজ্যিক তাগিদে ঢাকা রাতারাতি বাণিজ্যি কেন্দ্র হিসাবে বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্রে ঠাঁই পেলো। পাটের ব্যবসা করার জন্য ইংরেজ, ব্রিটিশ, আরমেনিয়ান, আর মাড়োয়ারীরা দলে দলে ঢাকায় চলে এলো। ঢাকা আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেলো।
এরপর থেকে শুরু হয় এই নগর বৃদ্ধির নতুন পালা। আধুনিকভাবে ঢাকাকে সাজানো শুরু হয়। ময়লা পরিষ্কার করা, জঙ্গলকাটা, রাস্তা বড়ো করা আর শহরবাসীর জন্য নানা প্রকার পৌর সুবিধা যেমন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ময়লা নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক বাতির সামান্য সুবিধা, পার্ক তৈরী করা, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, জনসাধারণের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে কবরস্থান ও শ্মশানঘাট তৈরি করা হয়। অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধির এ হাওয়া ঢাকা শহরের কিছু কিছু বিত্তবানদের সুযোগ এনে দেয় প্রাসাদোপম স্থাপত্য তৈরী করার। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঢাকার নবাবদের আহসান মঞ্জিল। এছাড়া মদনমোহন বসাকের প্রাসাদ, রূপলাল হাউস ইত্যাদিও রয়েছে। উয়ারীতে একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকাও গড়ে ওঠে। শহরবাসীর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও অবসর বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানাদির প্রচলন হয় যেমন- সঙ্গীত জলসার অনুষ্ঠান, মহররম ও জন্মাষ্টমীর মেলা-মিছিল, নবীন বিদ্যার চর্চা, পাঠাগার ব্যবহার ইত্যাদি।
এখানে উল্লেখ্য যে উনবিংশ শতকে ঢাকায় মোগল-ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতিতে বেশ কয়েকটি ইমারত গড়ে ওঠে। বিশেষতঃ ১৯০৬-১৯১১ সালের বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনের পূর্বক্ষণে ঢাকাকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর রাজধানী করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি ইমারত এ রীতিতে গড়ে তোলা হয়। সেগুলো আজো বিদ্যমান রয়েছে, যেমন: কার্জন হল, সেক্রেটারিয়েট ভবন (বর্তমানে মেডিকেল কলেজ), গভর্ণমেন্ট হাউস (বর্তমানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় ভবন)। সাময়িক শ্রীবৃদ্ধি হলেও ঢাকা আবার স্থবিরতার বুকে ঢলে পড়ে। কিন্তু অতি শীঘ্র ঢাকার প্রাণচাঞ্চল্য নিজস্ব গতিতে বেড়ে ওঠে। নতুন সূর্যের দীপ্তরশ্মি উদিত হয়। ১৯২১ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার বুকে মুক্তচিন্তা ও সংস্কৃতির জন্ম দেয়। সারা পূর্ববাংলা থেকে আগত জ্ঞানপিপাসু এবং জীবন সংগ্রামী একদল তরুণ ঢাকাকে বানালো সারা বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন বাস্তবায়নের রঙ্গমঞ্চ। এখানে রচিত হলো নতুন কবিতা, আঁকা হলো নতুন ছবি, বিতর্কের ঝড় উঠলো, বৈজ্ঞানিক গবেষণা সনাতনী বিশ্বাসের ভিত কাঁপিয়ে ফেললো। ঢাকা প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের শিক্ষা-সভ্যতার এক অভূতপূর্ব মিলনকেন্দ্র ও উপমাহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের শক্তিশালী দুর্গে পরিণত হলো। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলে ঢাকা পূর্বপাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে ইতিহাসের মানচিত্রে আবির্ভূত হয়। ঢাকার জনজীবনের চেহারা বদলে যায়। বহুসংখ্যক বিত্তবান ও শিক্ষিত হিন্দু পরিবার ভারতে চলে যায়। ভারত থেকে আগত স্মরণার্থীরাও ঢাকায় আশ্রয় নেয়। ঢাকার জনসংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। ইসলামী সংস্কৃতি আবার প্রাধান্য পায় তবে অন্যান্য সংস্কৃতির চর্চাও অব্যাহত থাকে। বাঙালী চিন্তা চেতনা নতুনভাবে আন্দোলিত হয়।
ঢাকার অর্থনৈতিক জীবনেও নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়। নতুন ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হয়, শিল্প কলকারখানা বৃদ্ধি পায়। জনজীবনের কোলাহলে ঢাকা নগরী মুখরিত হয়ে ওঠে। কিন্তু পূর্ববাংলার জনগোষ্ঠির ভাষা বাংলা। বাংলা ভাষাকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা জাতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকার করতে অনীহা প্রকাশের ফলে শুরু হয় পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এ দেশবাসীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সৃষ্টি করে। আন্দোলন ঢাকাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে। ঢাকার শহীদ মিনার তার সাক্ষী।
অবশেষে নয়মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয় ১৯৭১ সালে। ঢাকা এখন এই সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী এবং বারকোটি বাংলাদেশীর আশা-স্বপ্নের কেন্দ্রস্থল। হাজার হাজার মানুষের আগমন ঘটছে এখানে প্রতিদিন-কেউ চাকরীর কারণে, কেউ শিক্ষা, কেউ ব্যবসা আর কেউ নেহাৎই ভাগ্যান্বেষণে। জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটছে দ্রুত গতিতে। ১৯৬১ সালে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ৫ লক্ষ ৫৭ হাজার, ১৯৭৪ সালে ১০ লক্ষ ৭ হাজার, ১৯৮১ সালে ৩০ লক্ষ ৪৫ হাজার, ১৯৯০ সালে ৬০ লক্ষ। বর্তমানে এর জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি আর এই কারণেই ঢাকার উত্তরণ ঘটেছে মহানগরীতে। মহানগরী ঢাকাকে এখন মেগাসিটি আখ্যাত করা যায়। এর সীমানা এখন প্রায় ১৫৫ বর্গমাইল জুড়ে। জনসংখ্যা ও সীমানা বৃদ্ধির সাথে বেড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প। ঢাকা এখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মূল কেন্দ্র। যেখানে কাজ করছে হাজার হাজার বিশেষ করে মহিলা শ্রমিক। শিক্ষার ক্ষেত্রে বইছে এক নতুন জোয়ার নতুন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে আধুনিক শিক্ষা। সাহিত্য, সঙ্গীত ও চারুশিল্পের ঘটছে এক অপূর্ব বিকাশ। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এ নগরটি এখন এশিয়ার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
ঢাকার এই সম্প্রসারণ ও সমৃদ্ধির পথে একটি প্রতিবন্ধকতা কালো ছায়ার মতো পুঞ্জীভূত হচ্ছে। আর তা হচ্ছে বাংলাদেশের সার্বিক জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে ঢাকার আশ-পাশের গ্রামের হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য চলে আসছে এই মহানগরে। আরো আসছে সারাদেশ থেকে শিক্ষিত তরুণরা। এদের আগমনে এবং আরো অনেক কারণে যে জনসংখ্যার সমাগম হচ্ছে তার ফলে মহানগর ঢাকার ভবিষ্যত চেহারা যে কি হবে তা বলা মুস্কিল।
Reference
1. Habiba Khatun. ‘Pre Mughal Dhaka’. Dhaka Past Present Future, Asiatic Society of Bangladesh. Dhaka, 1991
2. A. Karim. Dacca- The Mughal Capital, Dhaka. 1964
3. Tavernier. Travels in India.
4. N. K. Sinha. The Economic History of Bengal. vol. 1.
5. Sharifuddin Ahmed. Dacca A Study in Urban History and Development, (Curzon Press) London. 1986
6. Shrifuddin Ahmed, Municipal Politics and Urban Development in Dhaka’. Dacca Past Present Future, Dhaka, 1991